বুধবার, ২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

যে নদী তাঁকে বারবার ফিরিয়ে আনে

মো. রুবেল আহমেদ

যমুনার স্রোতের কোনো স্থিরতা নেই চর জাগে, আবার মিলিয়ে যায় জলের গভীরে; বদলে যায় মানুষের ঠিকানাও। কিন্তু কিছু শেকড় কখনো ভেসে যায় না, নদীর তলদেশে পলির মতোই থিতু হয়ে থাকে বুকের গহীনে। সেই শেকড়ের অমোঘ টানেই হাজার মাইল দূরের আমেরিকা থেকে বারবার ফিরে আসেন মাসুম মাহবুবুর রহমান। তাঁর পিতা যে দুর্গম চরে জন্মেছিলেন, সেই চর আজও তাঁর কাছে নিছক একখণ্ড ভূমি নয় নিজের অস্তিত্বেরই একটি অংশ।

প্রবাসের ব্যস্ততা তাঁকে দূরে রেখেছে বটে, কিন্তু যমুনার ওপারের মানুষের দুঃখ-কষ্ট তাঁকে কখনো দূরে সরাতে পারেনি। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও চিকিৎসায় সহায়তার হাত বাড়িয়ে তিনি 
বারবার পাশে দাঁড়িয়েছেন চরের মানুষের। সুযোগ পেলেই আন্তর্জাতিক সংস্থার কর্মকর্তা-সহকর্মীদের নিয়ে ছুটে আসেন সেই দুর্গম চরাঞ্চলে, যেখানে তাঁর পরিবারের শেকড় গেঁথে আছে নদীর পলিমাটিতে। যমুনার ঢেউ পেরিয়ে তাঁর এই ফিরে আসা তাই কেবল জন্মভূমির প্রতি টান নয় এ যেন শেকড়ের কাছে ফিরে যাওয়ার এক অনন্য কাব্য।



পেছনে ফিরে দেখা

মাসুম মাহবুবের পূর্বপুরুষের ভিটে সিরাজগঞ্জের চৌহালী উপজেলায়। একসময় পরিবার পাড়ি জমায় আসাম অঞ্চলে। কিন্তু তাঁর বাবার দাদির মনে বাবার বাড়ির স্মৃতি উঁকি দিলে, বায়না ধরেন দেশে ফেরার। শেষে কয়েকটি পরিবার যমুনার বুক চিরেই ফিরে আসে, আবাস গড়ে বর্তমান টাঙ্গাইলের ভুঞাপুর উপজেলার শুশুয়া চরে।

সেকালে চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত পড়া শিক্ষিত দাদির অদম্য ইচ্ছাতেই মাসুম মাহবুবের বাবা বাহাজ উদ্দিন মিঞা নদীর সাথে লড়াই করে, দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে প্রাথমিক থেকে উচ্চ মাধ্যমিক শেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা সম্পন্ন করেন। মুক্তিযুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার পর বাংলাদেশ সরকারের বিভিন্ন দায়িত্ব পালন শেষে যুগ্ম সচিব হিসেবে অবসর নেন।

তিন ভাই ও দুই বোনের মধ্যে সবার বড় মাসুম মাহবুব বাবার চাকরির সুবাদে দেশের নানা প্রান্তে বেড়ে ওঠেন। ঢাকা থেকে মাধ্যমিক-উচ্চ মাধ্যমিক শেষে উচ্চশিক্ষার জন্য যান কানাডা, পরে ইউনিভার্সিটি অফ এশিয়া প্যাসিফিক থেকে স্নাতক ও মাস্টার্স সম্পন্ন করেন। আন্তর্জাতিক সংস্থা আইইউসিএন-তে কর্মরত থাকাকালীন সপরিবারে পান আমেরিকার নাগরিকত্ব, আর সাধারণ মানুষের কল্যাণে মনোনিবেশ করে পড়াশোনা করেন হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট নিয়ে। তাঁর সহধর্মিণী এলিজা সুলতানা, দুই কন্যা ও এক পুত্র। বড় মেয়ে মালিহা মাহবুব আমেরিকায় পড়াশোনা শেষে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যাপিটল হিলে কর্মরত।

নদীর কাছে ফেরার গল্প

নিজের গড়া 'শুশুয়া ভিল' এর মাধ্যমে চরের মানুষের জীবনমান উন্নয়নে কাজের সূচনা। রোহিঙ্গা সংকটের সময় আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থা ওবাট হেল্পার্সের সাথে যুক্ত হয়ে করোনাকালে শুশুয়া চরের ঘরে ঘরে পৌঁছে দেন চাল-ডাল-তেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী। চরবাসীর স্বাস্থ্যসেবার অভাবের কথা শুনে চিকিৎসার জন্য বিদেশ থেকে নিয়ে আসেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক। এছাড়াও গবেষকদের দ্বারা চরের মানুষের জীবনমান নিয়ে পরিচালনা করেন গবেষণা ও জরিপ।

পরে যুক্ত হন হিউম্যান কনসার্ন ইন্টারন্যাশনালের সাথে। কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পের পাশাপাশি শুশুয়ায় ৮৯ জন নারী শিক্ষার্থীর জন্য খাদ্য, বস্ত্র ও চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করেন ফলে শিক্ষার মান বেড়েছে, কমেছে বাল্যবিবাহ। বর্তমানে হিউম্যান কনসার্ন ইউএসএ-র সিইও হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি, শুশুয়াসহ আশপাশের ১০-১২ গ্রামের জন্য মাসে অন্তত ৪টি মোবাইল ক্লিনিক চালান, যেখানে প্রতি মাসে বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা পান এক হাজারের বেশি মানুষ।

বন্যার দুর্দিনে শুশুয়া চরের প্রতিটি ঘরে পৌঁছে দেন চাল, তেল, চিনি, আটা, সাবানসহ প্রয়োজনীয় সামগ্রী। শীতে চরাঞ্চলের প্রতিটি ঘরে পৌঁছে দেন শীতবস্ত্র।
 যে চরে কম্পিউটার ছিল বিলাসিতার প্রতিশব্দ, সেখানে গড়ে তুলেছেন উচ্চগতির ইন্টারনেটসহ কম্পিউটার ল্যাব, যেখানে ঢাকা থেকে অনলাইনে প্রশিক্ষকরা কোডিং শেখাচ্ছেন ২৪ জন শিক্ষার্থীকে। যমুনার বিভিন্ন চর এবং গোপালপুর-ভুঞাপুর অঞ্চলে বসিয়েছেন অসংখ্য টিউবওয়েল, ওয়াশ ব্লক ও মসজিদের অজুখানা। গোপালপুরের হাজীপুর দক্ষিণপাড়ায় একতলা মসজিদ নির্মাণের সম্পূর্ণ দায়িত্বও তাঁর কাঁধে। কোরবানির সময় অসহায় মানুষের জন্য কোরবানি করেন নিয়মিত, আর মানবকল্যাণের টানে ছুটে চলেন বিশ্বের নানা প্রান্তে।

আজকের সময়ে যখন ঢাকায় প্রতিষ্ঠিত হয়েই অনেকে ভুলে যান নিজের এলাকার খোঁজ, সেখানে বিশ্বের আরেক প্রান্তে থেকেও শেকড় ভুলতে না পারা মাসুম মাহবুবের এই মানবিকতা সত্যিই বিরল। এই মানবিক মানুষটির জন্য রইলো অজস্র শুভেচ্ছা। যমুনার স্রোত যেমন থামে না, তেমনি থেমে না থাকুক তাঁর এই মানবসেবার ধারাও।

SHARE THIS

Author:

সঠিক তথ্য পেতে সবসময় সমাবেশ ডটকমের সাথে থাকুন।

0 মন্তব্য(গুলি):